রবিবার ৪ অক্টোবর ২০২৬ - ০৯:০৮
নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ইরান প্রথম সারির শক্তি হবে: হামিদ মালেকি

ইরান নতুন বিশ্বব্যবস্থায় প্রথম অবস্থানে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির ধর্মীয় নগরী কোমের হাওযায়ে ইলমিয়ার উপ-পরিচালক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন হামিদ মালেকি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে হয়ে পড়ছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতি কমে আসবে। একই সময়ে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এশিয়ার দিকে বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য সরে যাচ্ছে। মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ইরান গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি শীর্ষস্থানীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: কোমে হযরত সাহেবে আসর (আ.ফা.)-এর মওকিবে (বিনামূল্যে সেবা স্টল) দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের বিভিন্ন দিক এবং এ প্রেক্ষাপটে ইরানের অবস্থান তুলে ধরেন।

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রসঙ্গ টেনে হামিদ মালেকি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেসব অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছে, সেখান থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে। ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের খবর শোনার পর তিনি শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর বক্তব্যের কথা স্মরণ করেন বলেও জানান।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শক্তি প্রদর্শন করলেও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারেনি। তাঁর ভাষায়, “যুদ্ধজাহাজ ও অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান নিয়ে এসেও তারা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির জন্য অনুরোধ করতে বাধ্য হয়েছে।” তাঁর মতে, ইরানের প্রয়াত বিপ্লবী নেতারা যে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির কথা বলেছিলেন, তা একে একে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

আধিপত্যের পুরোনো কাঠামো ভাঙছে
বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের দ্বিতীয় লক্ষণ হিসেবে তিনি পশ্চিমা আধিপত্যের সংস্কৃতির দুর্বল হয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করেন।

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন হামিদ মালেকি বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো এমন একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি করেছিল, যেখানে রাষ্ট্রগুলোকে মূলত দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হতো—আধিপত্য বিস্তারকারী এবং আধিপত্যের অধীন। তাঁর দাবি, ইরানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘প্রতিরোধের ফ্রন্ট’ এই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং এর ফলে পুরোনো আধিপত্যবাদী ব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, ইমাম খোমেনি প্রতিরোধের এই সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ইরানের শহীদ নেতারা তা আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্থায়ীভাবে ‘শাসক’ ও ‘শাসিত’—এমন বিভাজনের ধারণা এখন আগের মতো কার্যকর নেই।

প্রতিরোধের ফ্রন্ট আরও বিস্তৃত হবে
বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের তৃতীয় লক্ষণ হিসেবে তিনি প্রতিরোধের ফ্রন্টের বিস্তারের কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিরোধের ধারণা বর্তমানে ইরাক, ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে।

তিনি বলেন, এসব অঞ্চলের পাশাপাশি ইউরোপের কিছু তরুণের মধ্যেও প্রতিরোধের চেতনা গড়ে উঠছে এবং ভবিষ্যতে তারা প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান ঘোষণা করবে। একইভাবে সৌদি আরবেও প্রতিরোধের ফ্রন্ট গড়ে উঠবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পশ্চিম থেকে এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য
পশ্চিম থেকে এশিয়ার দিকে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য সরে যাওয়ার প্রসঙ্গে হামিদ মালেকি বলেন, ইরানের প্রয়াত বিপ্লবী নেতা বহু আগেই বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শক্তি পশ্চিম থেকে এশিয়ায় স্থানান্তরের কথা বলেছিলেন।

তিনি বলেন, “আজ আমরা এর বিভিন্ন লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি।”

ইরানের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে নানা ধরনের চাপ ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও দেশটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাঁর দাবি, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে ইরান বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বা পঞ্চম শক্তি।

ইয়েমেনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও দরিদ্র দেশ হয়েও ইয়েমেন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর মতে, সৌদি আরবও ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চেয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র অতীত অভিজ্ঞতার কারণে নতুন করে ওই যুদ্ধে জড়াতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে।

হামিদ মালেকির মতে, এসব ঘটনা পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এশিয়ার দিকে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত বহন করে।

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ইরানের সম্ভাবনা
বিশ্বব্যবস্থার এই পরিবর্তনকে ইরানের জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখেন হামিদ মালেকি। তিনি বলেন, “বিশ্ব যখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং শক্তির কেন্দ্র ইসলামী বিশ্বের দিকে সরে আসবে।”

তবে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইরানকে নিজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে উপযুক্ত অবস্থান তৈরি করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ইরানের সম্ভাবনার কথা বলতে গিয়ে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন।

প্রথমত, মানবসম্পদ। তাঁর মতে, মেধা, প্রতিভা ও দক্ষ মানবসম্পদের দিক থেকে ইরান অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক সম্পদ। তেল-গ্যাসসহ বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী ইরান। হামিদ মালেকি বলেন, ইরানের নিজস্ব সম্পদ ও সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে এবং অন্য দেশের দিকে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। তিনি এটিকেই ‘প্রতিরোধী অর্থনীতি’র অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

তৃতীয়ত, ভৌগোলিক অবস্থান। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম—চার দিকের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর সঙ্গে ইরানের যোগাযোগ রয়েছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে দেশটির বড় ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ইরানের এই কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দেশটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ও বাণিজ্যিক করিডরে পরিণত করা সম্ভব। তবে অতীতে সরকারগুলো এ সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেনি বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

‘ইরান একদিন প্রথম অবস্থানে পৌঁছাবে’
বক্তব্যের শেষাংশে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন হামিদ মালেকি ইসলামী বিপ্লবের প্রতি জনগণের সমর্থন এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে নানা চাপ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও যারা বিপ্লবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তাদের দৃঢ়তা প্রশংসনীয়।

তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে।” [সূরা আর-রাদ, ১৩:১১]

তিনি বলেন, মানুষ যদি আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের মর্যাদা রক্ষা করে এবং নিজেদের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে আল্লাহ সেই নেয়ামত আরও বৃদ্ধি করবেন।

এরপর তিনি বলেন, “আপনি যেমন বলেছিলেন, ইরান একদিন প্রথম অবস্থানে পৌঁছাবে।” এ প্রসঙ্গে তিনি ইসলামী ঐতিহ্যের বহুল উদ্ধৃত বাণী—“ইসলাম সমুন্নত হয়, তাকে কেউ অতিক্রম করতে পারে না”—উল্লেখ করেন।

তিনি আরও পবিত্র কোরআনের আরেকটি আয়াত উদ্ধৃত করেন, “তারা তাদের মুখের ফুঁ দিয়ে আল্লাহর আলো নিভিয়ে দিতে চায়; কিন্তু কাফেররা অপছন্দ করলেও আল্লাহ তাঁর আলো পূর্ণ করবেন। [সূরা আস-সফ, ৬১:৮]

বক্তব্যের শেষদিকে তিনি বলেন, এগুলো আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও তাঁর নির্ধারিত বিধান। তাই ঈমানদারদের দৃঢ়ভাবে নিজেদের অবস্থানে অটল থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “তোমরা অবিচল থাকলে, ইনশাআল্লাহ একের পর এক বিজয় প্রত্যক্ষ করবে।”

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha